শেকলবন্দি জীবন, রক্তক্ষরণ আর লাঞ্ছনা: ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা
তিনি কোনো কারাগারের নাম দিয়ে কথা শুরু করেননি; তিনি শুরু করেছেন একটি কুকুরের বর্ণনা দিয়ে। আল-জাজিরার অরিজিনাল ডকুমেন্টারি ‘বডিস অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’ (Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon)—যা আমি নিজে পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছি—সেখানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ জাকি আল-বাকরি বর্ণনা করেছেন সেই ভয়াবহ মুহূর্তের কথা। তাকে বিবস্ত্র করে, হাত-পা বেঁধে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল, আর ইসরায়েলি সৈন্যরা হাসাহাসি করছিল এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করছিল।
গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে ফেরা এবং খান ইউনিসের সাবেক বাসিন্দা আল-বাকরি জানান, তাকে দীর্ঘ ২০ মাস বন্দি রাখা হয়েছিল এবং এই সময়ে তাকে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ইসরায়েলি কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “তারা আমাদের গায়ের সব কাপড় খুলে নেয়। আমাদের হাত পেছন মোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়, পা বেঁধে ফেলা হয় এবং চোখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।”
এরপর তিনি এমন এক নির্যাতনের অভিযোগ করেন, যা ভাষায় বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, “বিবস্ত্র করার পর আমাকে ধর্ষণ করা হয়—একটি বিশাল কুকুর দিয়ে।” সাক্ষাৎকারের অন্য অংশে তিনি যোগ করেন, “আমাদের সাতজনকে ওই কুকুর দিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল।”
তার এই অভিযোগ মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়।
কয়েক মাস ধরে অনুসন্ধানের পর আল-জাজিরার তথ্যচিত্র দল এমন অনেক সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দির সাক্ষ্য জোগাড় করেছে, যারা জানিয়েছেন যে কুকুরকে কেবল ভয় দেখানোর অস্ত্র হিসেবে নয়, বরং যৌন অবমাননার এক নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বন্দিদের নগ্ন করে, চোখ ও হাত বেঁধে উপুড় করে শুইয়ে রাখা হতো; এরপর চলত মারধর, হুমকি, ভিডিও ধারণ এবং কুকুরের মাধ্যমে অমানবিক আক্রমণ। এই সাক্ষ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছে আল-জাজিরার অনুসন্ধানী তথ্যচিত্র—‘বডিস অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’।
ছবি- মোহাম্মাদ আল-বাকরিঃ “আমাদের হ্যান্ডকাফ পরানো হয়েছিল…… আমাদের হাত পেছন থেকে বাধা ছিল। আমাদের পা পেছন দিক থেকে এক করে ফেলা হয়েছিল আর আমাদের চোখও ঢেকে রাখা হয়েছিল।” [আল জাজিরা]
বিবস্ত্র, প্রহৃত ও ভিডিও ধারণ
ফিলিস্তিনি সরকারি সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে সাত লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েল বন্দি করেছে। জাতিসংঘের একটি পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৬৭ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বন্দি হওয়া ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৮ লাখেরও বেশি। মানবাধিকার সংস্থা ‘আদামির’ (Addameer)-এর ২০২৪ সালের এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯,৬০০ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দি বর্তমানে ইসরায়েলের হেফাজতে আছেন। এর মধ্যে ৩,৫৩২ জনকে ‘প্রশাসনিক বন্দি’ হিসেবে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছে। এই বন্দিদের মধ্যে ৩৪২ জন শিশু এবং ৮৪ জন নারীও রয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের জন্য কারাগারের অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি যেন এক বংশপরম্পরায় চলে আসা দুঃসহ যন্ত্রণা।
একজন ফিলিস্তিনি তার বাড়ি থেকে, চেকপোস্ট থেকে, হাসপাতালের ভেতর থেকে, আশ্রয়শিবির কিংবা সামরিক অভিযানের সময়—যেকোনো জায়গা থেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন। এরপর তাকে সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বন্দিশালা, পুলিশি হেফাজত এবং পরিশেষে ইসরায়েল প্রিজন সার্ভিস পরিচালিত বিভিন্ন কারাগারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ছবি—“তারা আমাদেরকে পেছন থেকে কুকুর দিয়ে আক্রমণ করেছে… কুকুর দিয়ে তারা আমাদেরকে পাগলের মতো আক্রমণ করেছে।” [আল জাজিরা]
বন্দিশালাগুলোর নাম হয়তো আলাদা—সদে তেইমান, ওফার, নেগেভ কিংবা আশকেলন—কিন্তু নির্যাতনের ধরণগুলো সবখানেই প্রায় এক। সেখানে একজন মানুষের নামের বদলে পরিচয় হয় একটি নম্বর। শরীর থেকে পোশাক কেড়ে নেওয়া হয়, চোখ বেঁধে ফেলা হয়, হাত-পা থাকে শিকলবন্দি। ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না, ঘুমানোর অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর নিয়ে আসা হয় কুকুর। বন্দিদের ধর্ষণের ভয় দেখানো হয়, অনেকের ওপর বাস্তবেই সেই যৌন সহিংসতা চালানো হয়। অনেকে অভিযোগ করেছেন, এই সব দৃশ্য ভিডিও করা হয়। আর অধিকাংশের মতেই, এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ জানিয়ে কোনো ফল মেলে না।
আল-বাকরির ক্ষেত্রে কুকুরটি কেবল সেখানে উপস্থিত ছিল না, বরং সেটি ছিল নির্যাতনের সরাসরি অংশ। তিনি বলেন, “তারা আপনার দিকে কুকুর লেলিয়ে দেবে এবং এরপর লাথি মারতে শুরু করবে। তারা পেছন থেকে পাগলের মতো আমাদের ওপর কুকুর ছেড়ে দিত।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা ছিল না। তারা হাসাহাসি করছিল আর সব কিছু ভিডিও করছিল।”
আল-জাজিরা এই সাক্ষ্যের প্রতিটি লোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ করছে না, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: বিবস্ত্র করা, হাত-পা বেঁধে ফেলা এবং যৌন সহিংসতার প্রায় প্রতিটি বর্ণনায় বারবার কুকুরের ব্যবহারের কথা উঠে এসেছে। এই অভিযোগগুলো কেবল কোনো একজন ব্যক্তির নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল ও নিষ্ঠুর ব্যবস্থার অংশ।
আল-জাজিরার তথ্যচিত্র ‘Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon’—এ জব (ছদ্মনাম) নামের দ্বিতীয় এক ভুক্তভোগীর কথা উঠে এসেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তার মুখ এবং কণ্ঠস্বর গোপন রাখা হয়েছে। তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে সৈন্যরা মৌখিক নির্দেশের মাধ্যমে কুকুরগুলোকে লেলিয়ে দেয়। তার ভাষায়, “আমার তো মনে হয় না ওটা কোনো কুকুর; ওটা আসলে ছদ্মবেশী এক মানুষ।”
তিনি আরও বলেন, “তারা কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেয়। সেখান থেকে বাঁচার কোনো পথ নেই; কুকুরটি আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেই। সে হয় আপনাকে ধর্ষণ করবে, নয়তো মুখে কামড়ে ধরা লোহার রড দিয়ে আপনার মাথা থেঁতলে দেবে।” তিনি আল-জাজিরাকে জানান, “কুকুরগুলো কেবল ঘেউ ঘেউ করে না, বরং তার পরিচালকের প্রতিটি সংকেত অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। কুকুরটিকে যা করতে বলা হয়, সে ঠিক তা-ই করে।”
রাষ্ট্রীয় দেয়ালের আড়ালে
সম্প্রতি ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনের এই নতুন সব তথ্য সামনে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও ইসরায়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং তাদের সমর্থক বিশ্লেষকরা এই প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও তাদের অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলো একে ‘ব্লাড লাইবেল’ বা ইহুদি-বিদ্বেষী মিথ্যা অপবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে—বিশেষ করে কুকুরের মাধ্যমে নির্যাতনের অভিযোগগুলো তারা কোনোভাবেই স্বীকার করতে নারাজ।
তবে ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং যেসব সংস্থা বন্দি নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহ করে, তাদের কাছে এসব অভিযোগ মোটেও আকস্মিক বা নতুন কিছু নয়।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এই তথ্যচিত্রের জন্য দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন চালাতে পশু বা কুকুর ব্যবহারের ইতিহাস অনেক পুরনো। তিনি বলেন, “এগুলো এমন সব সত্য যা আগে থেকেই সবার জানা ছিল।” আলবানিজ বন্দিদের দেওয়া বিবরণের ভিত্তিতে নির্যাতনের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন: “রক্ত বের না হওয়া পর্যন্ত শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা, মারধর, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া, অনাহারে রাখা, হাড়কাঁপানো শীতে ফেলে রাখা, চিকিৎসা সেবা না দেওয়া, কুকুরের আক্রমণ, নির্জন কারাবাস, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিবস্ত্র করা এবং পরিবারের সদস্যদের ধর্ষণ বা হত্যার হুমকি দেওয়া—এসবই সেই সুপরিকল্পিত নির্যাতনের অংশ।”
মানবাধিকার সংস্থা WCLAC-এর অ্যাডভোকেসি পার্টনার খরাইম জানান, মূলত বন্দিদের মুখ বন্ধ রাখতেই এই যৌন অবমাননা এবং হুমকির কৌশল ব্যবহার করা হয়। পুরুষ এবং কিশোররা প্রায়ই সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে এসব নিয়ে কথা বলেন না। নারীরা ভয় পান সামাজিক লাঞ্ছনার। আর শিশুরা এমন এক গ্লানি ও ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়, যা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা তাদের থাকে না।
ঠিক এই কারণেই আল-জাজিরার কাছে বেঁচে ফেরা মানুষদের এই সাক্ষ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো কেবল কোনো আইনি লড়াইয়ের নথি নয়; বরং ভয়, ক্ষোভ আর টিকে থাকার আর্তি থেকে উঠে আসা কিছু ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি।
সদে তেইমান এবং নির্যাতনের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
নাকাব (বা নেগেভ) মরুভূমিতে অবস্থিত ইসরায়েলি সামরিক বন্দিশালা ‘সদে তেইমান’ ৭ অক্টোবরের পরবর্তী ইসরায়েলি দমননীতির এক বিভীষিকাময় প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে চোখ বাঁধা ও শিকলবন্দি ফিলিস্তিনিদের করুণ ছবি, চিকিৎসায় অবহেলা, ভয়াবহ নির্যাতন এবং যৌন নিপীড়নের যেসব খবর চাউর হয়েছে, তা বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
সদে তেইমানে একজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে পাঁচজন ইসরায়েলি সেনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সেই অভিযোগগুলো তুলে নেয়। কিন্তু ‘বডিস অব এভিডেন্স: ইসরায়েলস ডার্কেস্ট ওয়েপন’ তথ্যচিত্রটি প্রমাণ করে যে, সদে তেইমানের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়।
একজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে ইসরায়েলের কয়েকটি জটিল স্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়: সামরিক আটকাবস্থা, গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদ, পুলিশি হেফাজত, সামরিক আদালত এবং সবশেষে আনুষ্ঠানিক কারাগার। এর মধ্যে ইসরায়েল কারাগার ব্যবস্থা এবং পুলিশ বিভাগ সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যার প্রধান কট্টরপন্থী নেতা ইতামার বেন-গাভির। আবার সদে তেইমানের মতো সামরিক বন্দিশালাগুলো চলে সেনাবাহিনীর আদেশে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়। আর বিচার মন্ত্রণালয় তদারকি করে রাষ্ট্রীয় আইনি নীতি ও বিচারিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, দায়বদ্ধতার জায়গাটি এখানে সচেতনভাবেই খণ্ডিত করে রাখা হয়েছে।
একজন বন্দিকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী, জিজ্ঞাসাবাদ করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা, পাহারা দেয় কারারক্ষীরা এবং বিচার চলে সামরিক আদালতে। যদি কখনো নির্যাতনের কোনো প্রশ্ন ওঠে, তবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান খুব সহজেই অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আসলে এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ইসরায়েলি রাষ্ট্রের সুপরিকল্পিত দমন-পীড়নের একটি ‘স্থাপত্য’ বা কাঠামো। একারণেই ফিলিস্তিনি মানবাধিকার কেন্দ্রের (Palestinian Centre for Human Rights) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রাজী সুরানি মনে করেন, সমস্যাটি কেবল একটি নির্দিষ্ট কারাগারকে নিয়ে নয়।
তথ্যচিত্রে সুরানি বলেন, “আমাদের কাছে অপরাধের তথ্য আছে, প্রমাণ আছে এবং কারা এই অমানবিক ব্যবস্থার আদেশদাতা (চেইন অব কমান্ড), তাদের তালিকাও আছে।” তার মতে, সদে তেইমানের এই ভয়াবহতা আসলে একটি বিশাল পাহাড়ের চূড়ামাত্র—আসল চিত্রটি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত এবং গভীর।
ছবি—রাজী সুরানি: “আমাদের সামনে অপরাধ রয়েছে। রয়েছে অপরাধের প্রমাণ। এমনকি আমাদের সামনে চেইন অফ কমান্ডও রয়েছে।” [আল জাজিরা]
যৌন সহিংসতা: নির্যাতনের এক হাতিয়ার
কারাগারে যৌন সহিংসতার সংজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ধর্ষণ, ধর্ষণের হুমকি, জোরপূর্বক বিবস্ত্র করা, শরীরের সংবেদনশীল অঙ্গে তল্লাশি এবং যৌন অবমাননা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্যভেদে এই ধরনের কর্মকাণ্ড যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ কিংবা গণহত্যার শামিল হতে পারে।
‘Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon’ তথ্যচিত্রে বেঁচে ফেরা মানুষগুলো তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের নানা ভয়াবহ রূপ বর্ণনা করেছেন। উত্তর গাজার বাসিন্দা জব (ছদ্মনাম) জানান, ইসরায়েলি সৈন্যরা তাকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করেছে। তিনি আরও এক লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে বলেন, একজন নারী সৈন্য কৃত্রিম লিঙ্গ (Strap-on device) ব্যবহার করে তাকে নির্যাতন করছিল, আর পাশে দাঁড়িয়ে অন্য সৈন্যরা হাততালি দিচ্ছিল।
শিরিন (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম পরিবর্তিত) নামের আরেকজন নারী জানান, তাকে বারবার বিবস্ত্র করা হতো। তিনি বলেন, “তারা আমাকে একটি ঘরে নিয়ে যেত এবং গায়ের সব পোশাক খুলে ফেলতে বাধ্য করত।” এরপর তিনি বর্ণনা করেন, কীভাবে অত্যন্ত আপত্তিকর ও বীভৎস কায়দায় তার ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছিল।
ছবি—রাজী সুরানি: “আল-জাজিরার ডকুমেন্টারি ‘Bodies of Evidence’-এর একটি পোস্টার
আদনান—পরিচয় গোপন রাখতে ব্যবহৃত একটি ছদ্মনাম—অধিকৃত পশ্চিম তীরের জেনিনে পড়াশোনা করা সতেরো বছরের এক কিশোর। স্কুলে যাওয়ার পথে সে হঠাৎ পড়ে গেল ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে। সৈন্যরা তার দিকে একটি বিস্ফোরক ছুড়ে মারল; বিস্ফোরণে সে হারাল তার ডান হাত। কাটা হাত নিয়ে সে তখনও সুস্থ হয়ে উঠছে—সেই অবস্থায়, মাত্র এক সপ্তাহ পরে, সেই একই সেনাবাহিনী ফিরে এসে তাকে গ্রেপ্তার করল। পাঁচ মাস আটক রাখা হয় তাকে। সে জানায়, শরীরের স্পর্শকাতর অংশে বারবার মার খেতে হয়েছে তাকে, আর বারবার উলঙ্গ করে তল্লাশি চালানো হয়েছে — সবটা ঘটেছে সেই আঘাতের ঠিক পরেই, যে আঘাতে সে হারিয়েছিল নিজের হাত।
মোহাম্মদ আবু কাবাশ প্রথমে শুনতে পেল কুকুরের ডাক। রাত তখন প্রায় একটা। অধিকৃত পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় খিরবেত হামসা আল-ফাওকাইনে শুক্রবারের রাতে তার পরিবার গভীর ঘুমে। কিসে কুকুরগুলো অস্থির হয়ে উঠল দেখতে, হাতে একটা টর্চ নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল বাইরে। “টর্চের আলো পাহাড়ের দিকে ফেলতেই চমকে গেলাম,” সে বলে, “দেখি একদল মানুষ—কয়েক দিক থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে।”
নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল সে। “ভয়ে আর আতঙ্কে আমি প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিলাম,” মোহাম্মদ বলে, “নিজেকে ধরে রাখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।” এর কিছুক্ষণ পরেই বসতি স্থাপনকারীরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। “চারজন আমাকে আক্রমণ করল। তারা আমাকে চেপে ধরে হাত বেঁধে ফেলল,” সে বলে। হাতে ছুরি মারা হলো তাকে, সারা শরীরে চলল মারধর।
তার ভাই সুহাইব আবু কাবাশ জানায়, বসতি স্থাপনকারীরা এসেছিল তখন, যখন শরণার্থী শিবিরের মানুষ এখনো ঘুমে। “তারা এখানকার প্রতিটা ঘরে ঢুকে পড়ল—প্রতিটা ঘরে বিশজন করে বসতি স্থাপনকারী। একজন হাতকড়া পরাচ্ছে, আরেকজন মারছে,” সে স্মরণ করে। সুহাইব বলে, “বসতি স্থাপনকারীরা পরিবারের সব ভেড়া লুট করে নিয়ে গেছে, শিশুদের মেরেছে, তার হাতে হাতকড়া পরিয়েছে, কাপড় খুলে নিয়েছে এবং তার যৌনাঙ্গ বেঁধে দিয়েছে। “তারা আমাকে একশো মিটার টেনে নিয়ে গেল, গায়ে পানি আর মাটি ছিটিয়ে দিল।”
মোহাম্মদ বলে, সে দেখেছে কয়েকজন বসতি স্থাপনকারী তার ভাইকে ঘিরে ধরেছে। “অনেক বেশি লোক তাকে মারছিল,” সে বলে। “ঠিক কতজন জানি না — দশ, নয়, নাকি আট। অনেক বড় দল।”
তারা তার ভাইয়ের কাপড় খুলে মারধর করল। এরপর সে সাক্ষাৎকারে একটু থামে। “বলতে পারব?” সে জিজ্ঞেস করে। “তারা একটা প্লাস্টিকের জিপ এনে তার পুরুষাঙ্গে বেঁধে দিল।”
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে সুহাইব সেই প্লাস্টিকের বাঁধন তুলে ধরে দেখায়—যা দিয়ে, সে বলে, “আমার হাত, পা আর যৌনাঙ্গ বাঁধা হয়েছিল।”
মোহাম্মদ বলে, বসতি স্থাপনকারীরা চলে যাওয়ার পর সুহাইব তার কাছে এল—হাঁটতেই পারছে না এমন অবস্থায়। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। “আমি সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম,” মোহাম্মদ বলে। “এই পরিস্থিতিতে কী করব? এটা এত স্পর্শকাতর জায়গা—কীভাবে সামলাব?”
চারপাশ অন্ধকার। তখন সে সুহাইবের স্ত্রীকে ডাকল, বলল টর্চ ধরে রাখতে। তারপর নিজে একটা ছুরি নিল। মোহাম্মাদ বলে, “ছুরি দিয়ে সেই বাঁধন কাটলাম। রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল।”
দুই ভাই বলে, আক্রমণটা শুধু সুহাইবের উপর ছিল না। অন্য সাক্ষাৎকারে সুহাইব জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীরা মেয়েদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল, সবাইকে একটা তাঁবুতে জড়ো করেছিল এবং হুমকি দিয়েছিল—আমাদের লোকেরা জায়গা না ছাড়লে মেয়েদের ধর্ষণ করা হবে আর শিশুদের তুলে নিয়ে যাওয়া হবে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ বলে, চারশো ভেড়া—পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস — লুট হয়ে যাওয়ার পর তাদের হাতে এখন “কিছুই নেই।”
সে বলে, “শুধু আকাশটা আছে এখন আমাদের।”
ক্ষতিটা সে মাপে প্রজন্মের হিসাবে। “পঞ্চাশ বছরের পরিশ্রম”—তার নিজের, তার বাবার, তার আগে তার দাদার— সব “শেষ হয়ে গেল এক ঘণ্টারও কম সময়ে, মাত্র চল্লিশ মিনিটে।”
ছবি—শুয়াইব আবু কাবাশঃ “আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছিলাম...তারপর একটা আর্মির গাড়ি অনেক দেরিতে আসে। ততোক্ষণে আমাদের অনেক প্রহার করা হয়ে গেছে।”
সোহাইব জানাল, তার পরিবার সাহায্যের জন্য আকুতি জানালেও তা পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। সে বলে, “আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছিলাম...তারপর একটা আর্মির গাড়ি অনেক দেরিতে আসে। ততোক্ষণে আমাদের অনেক প্রহার করা হয়ে গেছে।”
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। তবে আজ পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকেই কোনো শাস্তি পেতে দেখা যায়নি। এমনকি আল-জাজিরার সাথে কথা বলা ভুক্তভোগীদের কেউই কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।
তা সত্ত্বেও মোহাম্মদ সাফ জানিয়ে দিল, তার পরিবার নিজের ভিটাবাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। সে বলে, “আমরা অবিচল আছি এবং নিজের মাটিতে শেষ পর্যন্ত অনড় থাকব। আমরা এখানেই থাকব, আমাদের ভিটা ছেড়ে কোথাও যাব না।”
অস্বীকারের সংস্কৃতি
নিপীড়নের অভিযোগগুলো যে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার অংশ—তা মানতে নারাজ ইসরায়েল। ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ (আইপিএস) দেশটির গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, তারা একটি সুশৃঙ্খল নিরাপত্তা সংস্থা এবং সম্পূর্ণ ‘আইন মেনে’ ও ‘কঠোর নজরদারির’ মধ্যে কাজ করে। তাদের দাবি, বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেই তাদের আটকে রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়েহিয়েল লেইটারও একই সুরে কথা বলেন। যৌন নির্যাতনের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বেআইনি আচরণের যেকোনো অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার কাছে জমা দেওয়া উচিত। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে যেভাবে অভিযোগগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়, এখানেও তাই করা হবে।”
তবে ‘Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon’-এ সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারি এই ব্যবস্থাগুলো বন্দিদের রক্ষা করতে আসলে কোনো কাজে আসছে না। এক সাবেক বন্দি জানান, তাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার আগে চারজন নারী এসেছিলেন, যারা নিজেদের আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দেন। তারা খাবার, মারধর এবং নির্যাতনের সময় কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে কি না—সেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন।
সেই বন্দির স্মৃতিচারণ, “তারা আমাদের জিজ্ঞেস করছিলেন—খাবার কেমন দেওয়া হচ্ছে? কতটুকু পাচ্ছ? আর কী কী সমস্যা হচ্ছে? ওরা তোমাদের সাথে কী করছে? কীভাবে মারধর করছে? কুকুর দিয়ে ভয় দেখাচ্ছে কি?”
তিনি আরও বলেন, “আমরা তাদের সব বিস্তারিত খুলে বলেছিলাম। তারা সেসব লিখে নিয়ে গেলেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হলো না। কোনো পরিবর্তন আসেনি; উল্টো মারধরের মাত্রা আরও বেড়ে গেল।”
দায়বদ্ধতা এড়ানোর জন্য এই অভিযোগগুলোকে ‘ব্লাড লাইবেল’ (Blood Libel) বা ইহুদি-বিদ্বেষী রটনা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ঐতিহাসিকভাবে, ‘ব্লাড লাইবেল’ বলতে একটি চরম ইহুদি-বিদ্বেষী মিথ্যাকে বোঝানো হয়—যেখানে দাবি করা হতো যে ইহুদিরা ধর্মীয় আচার পালনের জন্য খ্রিস্টান শিশুদের হত্যা করে। কয়েক শতাব্দী ধরে এই কাল্পনিক অজুহাতে ইহুদিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন ও সহিংসতা চালানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্যের ওপর যখন এই ‘তকমা’ সেঁটে দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়। এটি তখন বন্দিদের ওপর হওয়া নির্যাতনের দিক থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দিয়ে অভিযোগকারীদের উদ্দেশ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। অর্থাৎ, নির্যাতনের অভিযোগটিকেই তখন ‘ইহুদি-বিদ্বেষ’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়।
তবে বর্তমান অভিযোগগুলো মধ্যযুগীয় কোনো রূপকথা নয়। এগুলো আধুনিক বন্দিশালায় চলা নির্যাতনের বাস্তব চিত্র, যা সাবেক বন্দিরা বর্ণনা করেছেন। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, ইসরায়েলি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এসব নিয়ে সোচ্চার হয়েছে এবং পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর যে খোদ জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বারবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইসরায়েলি আইনজীবী বেন মারমারোলি, যিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের পক্ষে আইনি লড়াই করেন, ২০২৪ সালের এপ্রিলে তার মক্কেলদের সাথে দেখা করেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর বন্দিদের সাথে সেটিই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎ। আল-জাজিরার কাছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি সামনে কোনো মানুষ নয়, স্রেফ জ্যান্ত কঙ্কাল দেখছিলাম। তাদের দৈনিক মাত্র ৮০০ ক্যালরি খাবার দেওয়া হচ্ছিল। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন হলোকাস্ট (ইহুদি নিধনযজ্ঞ) সিনেমার কোনো বন্দি।”
অথচ একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জাতিসংঘের নির্ধারিত ন্যূনতম ক্যালরির পরিমাণ হলো প্রতিদিন ২,১০০।
ছবি—আইনজীবী বেন মারমারোলি: “তাদের দৈনিক মাত্র ৮০০ ক্যালরি খাবার দেওয়া হচ্ছিল। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন হলোকাস্ট (ইহুদি নিধনযজ্ঞ) সিনেমার কোনো বন্দি।” [আল জাজিরা]
জাতিসংঘের হুঁশিয়ারি
২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইসরায়েলকে একটি বিশেষ ‘সতর্কবার্তায়’ রাখেন। সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িত থাকার নির্ভরযোগ্য সন্দেহ রয়েছে এমন পক্ষগুলোর বার্ষিক তালিকায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইসরায়েলি দূতের কাছে পাঠানো চিঠিতে গুতেরেস বিভিন্ন কারাগার, আটক কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটিতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য, একই প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো হামাসকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি কোনো সাধারণ অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আসেনি, বরং এটি এসেছে জাতিসংঘের সংঘাতকালীন যৌন সহিংসতা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সরাসরি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। গুতেরেস আরও উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েল জাতিসংঘের পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকার করায় এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট—যখন কোনো রাষ্ট্র স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের সুযোগ দেয় না, তখন বাইরের কেউ তা যাচাই করতে পারেনি—এই অজুহাত দেখিয়ে রাষ্ট্রটি আর দাবি করতে পারে না যে সেখানে কোনো অপরাধ ঘটেনি।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিও (আইসিআরসি) জানিয়েছে যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে তারা ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাথে দেখা করার কোনো সুযোগ পায়নি। তারা বন্দিদের কাছে পৌঁছানো এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার জোর দাবি জানিয়েছে।
ভুক্তভোগী ও আইনজীবীদের কাছে পরিস্থিতিটি এক নিষ্ঠুর ‘দুষ্টচক্রের’ মতো। ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে বন্ধ দরজার ভেতরে তাঁদের ওপর ঠিক কী ঘটেছে তার প্রমাণ দিতে, অথচ যেসব সংস্থা সেই দাবির সত্যতা যাচাই করতে সক্ষম, তাদের দরজার বাইরে আটকে রাখা হচ্ছে।
স্মৃতি যখন সাক্ষ্য দেয়
এই তথ্যচিত্রটির নাম কেবল কোনো রূপক নয়। নথিপত্র যা অস্বীকার করে, শরীর তা মনে রাখে। শরীরের কালশিটে দাগ এক সময় মুছে যায়, নথিপত্র গায়েব হয়ে যায়, আর নির্যাতনের ভিডিওগুলো থাকে খোদ নির্যাতনকারীদেরই জিম্মায়। চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্যগুলোও হয় গোপন রাখা হয়, নয়তো কোনো রেকর্ডই রাখা হয় না। সাক্ষীদের অনেক সময় বদলি করা হয়, মুক্তি দেওয়া হয়, দেশছাড়া করা হয় কিংবা লোকলজ্জার দোহাই দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়।
কিন্তু যারা বেঁচে ফেরেন, তাঁরা কিছুই ভোলেন না।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘকাল ধরে বন্দিদের সেই স্মৃতিগুলোকেই দালিলিক প্রমাণে রূপান্তরের চেষ্টা করছে—নাম, তারিখ, আঘাতের চিহ্ন, বন্দিশালার পথ, চিকিৎসার রেকর্ড, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং আইনি অভিযোগের মাধ্যমে নির্যাতনের একটি সুনির্দিষ্ট ধরন বা প্যাটার্ন তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
‘ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’ (ডিসিআই) ফিলিস্তিন শাখার পরিচালক আয়েদ আবু ইকতাইশ শিশুদের ওপর হওয়া নির্যাতনের তথ্য সংগ্রহে কাজ করছেন। মানবাধিকার কর্মী তাহসিন আলাইয়ান কাজ করছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে। মানবাধিকার আইনজীবী তায়াব আলি খান মামলা লড়ছেন সার্বজনীন বিচারিক এখতিয়ারের অধীনে। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ চান্তাল মেলোনি কাজ করছেন ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্য আইনি আঙিনায় তুলে ধরতে। অধ্যাপক ত্রিয়েস্তিনো মারিনিয়েলো এই মামলাগুলোকে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে এই তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ের পরিণাম অনেক সময় ভয়াবহ হয়। তথ্যচিত্রটিতে একজন ফিলিস্তিনি আইনজীবী বর্ণনা করেন যে, তিনি ১৫ বছরের এক কিশোরের ওপর চলা পৈশাচিক যৌন নির্যাতনের কথা রিপোর্ট করেছিলেন। বিষয়টি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকেও জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, “তদন্ত শুরু করার পরিবর্তে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ উল্টো ডিসিআই-এর অফিসে হানা দিল এবং এরপর ‘ডিসিআই প্যালেস্টাইন’-কে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হলো।”
ছবি—আয়েদ আবু ইকতাইশ,“ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’ (ডিসিআই) ফিলিস্তিন শাখার পরিচালক। [আল জাজিরা]
বিচারের শূন্যতা
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেন যে, যেকোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি, ইসরায়েলি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বছরের পর বছর ধরে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে আসছে যে, ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের দায়ে কোনো অপরাধীর সাজা হওয়া অত্যন্ত বিরল এক ঘটনা। ইসরায়েলি আইনজীবী মারমারোলি সোজাসুজি বলেন, “আমরা জানি এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা ধর্ষণ আর অকথ্য নির্যাতনকে একপ্রকার মৌন সম্মতি দিয়ে রেখেছে।”
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সক্রিয়কর্মী এবং কারা কর্তৃপক্ষ মারমারোলির বিরুদ্ধে দেশটির ‘বার অ্যাসোসিয়েশনে’ অভিযোগ দায়ের করেছে। কিন্তু তিনি তাতে মোটেও দমে যাননি। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “এমনকি ওরা যদি আমার ওকালতির লাইসেন্সও কেড়ে নেয়, তবুও আমি চুপ থাকব না।”
ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী লিয়া সেমেল গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি বন্দিদের পক্ষে লড়াই করছেন। তিনিও এই তথ্যচিত্রে ইসরায়েলের আইনি জগতের সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে হাজির হয়েছেন, যিনি আইনের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রের অপরাধ ধামাচাপা দিতে অস্বীকার করেন।
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক ও দ্বিতীয় ভাইস-প্রেসিডেন্ট কুনো টারফুসার মনে করেন, সংকট কেবল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার ভেতরেই নয়, বরং খোদ আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। তিনি বলেন, “[ভ্লাদিমির] পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়াকে ‘ভালো’ বলা হচ্ছে, অথচ [বেনজামিন] নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তেমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ‘ভালো’ নয়—একজন বিচারক হিসেবে আমি মনে করি এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।”
এই বক্তব্যটি নিছক কোনো কথার কথা নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের দিকে আঙুল তোলে। আন্তর্জাতিক আইন যদি কেবল শক্তিশালী দেশগুলোর শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, তবে ভুক্তভোগীরা বুঝে নেয় যে—আইন তাদের জন্য কোনো ‘বর্ম’ নয়; বরং এটি স্রেফ শক্তিশালীদের গায়ের জোর খাটানোর আরেকটি ভাষা মাত্র।
ছবি—কুনো টারফুসার,“আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক ও দ্বিতীয় ভাইস-প্রেসিডেন্ট, বলেন সমস্যা কেবল ইসরায়েলের সিস্টেমে না, বরং পুরো আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার মধ্যেই [আল জাজিরা]
তদন্ত যা নিশ্চিত করে
‘‘Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon’ তথ্যচিত্রটি এই দাবি করে না যে, তারা ইসরায়েলি আটক কেন্দ্রগুলোর ভেতরে থাকা প্রত্যেক ভুক্তভোগীর ওপর হওয়া প্রতিটি হামলার খুঁটিনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে। এটি এমন দাবিও করে না যে, প্রত্যেক ইসরায়েলি সেনা, রক্ষী বা তদন্ত কর্মকর্তা এই নির্যাতনে অংশ নিয়েছেন। কিংবা প্রতিটি কারাগার বা জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে একইভাবে যৌন সহিংসতা ঘটেছে—এমন দাবিও এখানে করা হয়নি।
তবে এই তথ্যচিত্রটি যা অকাট্যভাবে তুলে ধরেছে, তা হলো বিভিন্ন প্রান্তের ফিলিস্তিনিদের দেওয়া একই ধরনের সাক্ষ্য। তারা প্রত্যেকেই আটক অবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে যৌন সহিংসতা, নগ্ন হতে বাধ্য করা, কুকুরের হামলা, ভিডিও ধারণ করা, হুমকি, মারধর এবং চরম অবমাননার কথা বর্ণনা করেছেন। এটি এমন সব আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য নথিবদ্ধ করেছে, যারা জানিয়েছেন যে তাদের অভিযোগগুলো হয় উপেক্ষা করা হয়েছে, নয়তো এর জন্য তাঁদের উল্টো শাস্তি দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নির্যাতনের ধরনগুলো বন্দিদের মানুষ হিসেবে অস্বীকার করা এবং অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার একটি বৃহত্তর ব্যবস্থারই অংশ। তথ্যচিত্রটি এমন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে তুলে ধরেছে যেখানে দায়বদ্ধতা সেনা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, কারারক্ষী, পুলিশ ও আদালতের মধ্যে এমনভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে যে, গুরুতর জখম দৃশ্যমান হওয়ার পরও প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অভিযোগ জমা দেওয়ার সুযোগ থাকা আর সেই অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার হওয়া—এক কথা নয়।
পরিদর্শক দল থাকা আর সেই পরিদর্শকদের মাধ্যমে নির্যাতন বন্ধ হওয়া—দুটো ভিন্ন বিষয়। একইভাবে, কারাগারগুলো আইন মেনে চলে দাবি করা আর স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের জন্য সেগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়া—কখনোই এক নয়।
বিচারের কাঠগড়ায় বিশ্ব
মুখ খোলার কারণে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত কি না—জানতে চাইলে আইনজীবী মারমারোলি বলেন, “বাস্তবতাকে বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করার এই খেলায় আমি নেই। এর জন্য যদি আমাকে কোনো মূল্য দিতে হয়, তবে তা-ই সই।”
সত্তরের দশকের শুরু থেকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের পক্ষে লড়া প্রবীণ ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী লিয়া সেমেল ইসরায়েল সরকারের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। একদিকে ফিলিস্তিনি বন্দিরা এমন বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে যেখানে তাদের মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে, অন্যদিকে অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রমাণিত যুদ্ধাপরাধগুলো দেশটির আদালতে বিচারহীনই থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “তাদের (বন্দিদের জন্য) বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক আইনজীবী আনতে দেওয়া হোক। তখন দেখা যাবে আসল সত্য কী।”
আল-জাজিরা এই তথ্যচিত্রের জন্য যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, সেই ভুক্তভোগীদের অনেকের কাছেই বিশ্ব তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। কারণ দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ব এই অবিচার দেখেও না দেখার ভান করে আছে।
তথ্যচিত্রের শেষ দিকে একজন ভুক্তভোগী নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনা থামিয়ে দিয়ে বাইরের পৃথিবীর মানুষের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, “আপনারা কোথায়? কেন দেখছেন না আমরা কীসের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি? আমরা কেন এতটা একা? কী ঘটছে তা কি আপনারা দেখছেন না? পৃথিবীটা আজ কোথায়?”
এই প্রশ্নটিই তথ্যচিত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এটি ফিলিস্তিনিদের সাক্ষ্য নিয়ে চলমান বিতর্কেরও মূল বিষয়। যখন কোনো ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন; কিন্তু যে পরিবেশে বা ব্যবস্থায় এই ধরনের নির্যাতন সম্ভব হচ্ছে—তা নিয়ে ক্ষোভ খুবই সামান্য। বিনা বিচারে আটকে রাখা, বন্ধ সামরিক কেন্দ্র, পর্যবেক্ষকদের বাধা দেওয়া, আইনজীবীদের শাস্তি দেওয়া এবং মামলা খারিজ করে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোই এই নির্যাতনের পথ প্রশস্ত করছে। এখানে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যেখানে প্রমাণ যাচাইয়ের আগেই যৌন সহিংসতার মতো অভিযোগকেও স্রেফ ‘অপপ্রচার’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেন, লক্ষ্যবস্তু কেবল ফিলিস্তিনিদের শরীর নয়, বরং তাদের সত্তা—যাকে বলা হয় ‘সুমুদ’ বা অদম্য মনোবল, যা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রেরণা দেয়।
গাজার এক ভুক্তভোগী বলেন, কারাগারগুলোতে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল যাতে ফিলিস্তিনিরা আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। তিনি দর্পভরে বলেন, “কিন্তু আমরা ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি।”
‘‘Bodies of Evidence: Israel’s Darkest Weapon’ ঠিক এই বিষয়টিই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এটি কেবল যৌন সহিংসতার গল্প নয়, এটি ভুক্তভোগীদের দমে না যাওয়ার গল্প। তারা এখনো কথা বলছে, এবং বিশ্ব আর কখনোই বলতে পারবে না যে—তারা এসব কথা শোনেনি বা দেখেনি।
এই তথ্যচিত্রটি তৈরির সময় আল-জাজিরা কয়েক ডজন সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দি ও তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে। অনেকে কথা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় কেউই রাজি হননি। কেউ নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেছেন, কেউ আবার পশ্চিম তীর বা গাজায় থাকা আত্মীয়দের বিপদের কথা ভেবেছেন—যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিত গ্রেপ্তার, অভিযান এবং বাড়িঘর ধ্বংস করে চলেছে। আবার অনেকে স্রেফ হতাশ হয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা বারবার একটি কথাই বলছিলেন— “এসব বলে আর লাভ কী?” এই নীরবতাও এই গল্পের একটি বড় অংশ।
যারা সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হয়েছেন, তাদের অনেকে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন এবং কারও কারও মুখ ও কণ্ঠস্বর গোপন রাখা হয়েছে। তারা তিনটি কারণে এই সুরক্ষা চেয়েছিলেন: ইসরায়েলি বাহিনীর প্রতিহিংসার ভয়, পরিবারের নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতার কথা জনসমক্ষে বলার সামাজিক সংকোচ। যেখানে ভুক্তভোগীরা নাম ও পরিচয় প্রকাশে রাজি হয়েছেন, আল-জাজিরা তা প্রকাশ করেছে। আর যেখানে পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে, সেখানে তাদের বক্তব্যগুলোকে মেডিকেল রেকর্ড, আইনি নথি, আইনজীবীদের সাক্ষ্য এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া হয়েছে।
পুরো ডকুমেন্টারিটি এখানে দেখতে পাবেন।









